২০। সূরা ত্বহা

২০ তম সূরা ত্ব-হা, আয়াত ১৮ এ আল্লাহর ১ টি প্রশ্নের জবাবে মুসা (আ) ৩ টি জবাব দিয়েছেন। প্রিয় আল্লাহর সাথে কথাকে তিনি দীর্ঘায়িত করতে চাইছিলেন। জীবনের এই সূবর্ন সুযোগকে ভালভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন।

প্রশ্ন  ১ এ আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন ডান  হাতে ওটা কি? এর জবাবে তিনি ৩ টি উত্তর দিয়েছেন। এটা আমার লাঠি, এতে আমি ভর দেই এবং এর সাহায্যে আমার মেষপালের জন্য পাতা পাড়ি এবং এতে করে আমার আরও অনেক কাজ হয়। 

৫৩ তম আয়াতে আল্লাহ বলেছেন তিনি উদ্ভিদ জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ স্রষ্টা, একক, অদ্বিতীয়। স্রষ্টা এর সাথে সৃষ্টি আলাদা, ভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন করার জন্য হয়তো এভাবে জোড়া করেছেন। 


মূসা আলাইহিস সালাম-এর লাঠি সাপ হয়ে যাওয়া বিষয়ক যে আয়াতগুলো আছে, সেগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন সাপের জন্য কোথাও হাইয়াতুন (حية) আর কোথাও সু’বানুন (ثعبان) শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু বাংলা অনুবাদ খুলে দেখুন সবখানে ‘সাপ’ লেখা আছে। সাপের আরবী শব্দ ব্যবহারের ভিন্নতার কারণে অর্থ ও মর্মতে যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে অনুবাদে সেটা প্রকাশিত হয়নি।

৫৩ তম আয়াতে আল্লাহ বলেছেন তিনি উদ্ভিদ জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ স্রষ্টা, একক, অদ্বিতীয়। স্রষ্টা এর সাথে সৃষ্টি আলাদা, ভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন করার জন্য হয়তো এভাবে জোড়া করেছেন। 


হাইয়াতুন মানে হলো ছোট সাপ। আর সু’বানুন মানে বিশাল বড় সাপ। দুইটাই তো সাপ। তবে সাপে সাপে পার্থক্য আছে। এবার আমরা এই শব্দ দু'টি যে আয়াতে ব্যবহার হয়েছে সে আয়াত দু’টি দেখি।

মূসা আলাইহিস সালাম যখন সপরিবারে রাতের বেলায় সফর করছিলেন এবং আগুনের প্রয়োজন হওয়ার কারণে এদিক-ওদিক তা খোঁজাখুঁজি করছিলেন সে সময় আল্লাহ তাঁকে ডাক দিয়ে বলেন,
قَالَ أَلْقِهَا يَا مُوسَى ۞ فَأَلْقَاهَا فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَى
“তিনি (আল্লাহ) বললেন, তুমি তা নিক্ষেপ করো হে মূসা। অতপর তিনি তা নিক্ষেপ করলেন এবং অমনি তা একটি সাপ হয়ে ছুটতে লাগল।”

এই আয়াতে ‘হাইয়াতুন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ এখানে মূসা আলাইহিস সালাম-কে শুধু লাঠি সাপ হয়ে যাবার মুজিযা দেখানো উদ্দেশ্য ছিল। বড় সাপ প্রদর্শন করে ভয় দেখানো উদ্দেশ্য ছিল না। তাই লাঠিটা নিক্ষেপ করার পর তা সাপে রূপান্তরিত হওয়াই যথেষ্ট ছিল।

এবার অন্য আয়াতটি দেখি। মূসা আলাইহিস সালাম যখন তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে ফিরআউনের দরবারে গেলেন তখন সে মূসা আলাইহিস সালাম-এর কাছে তাঁর নবুওয়তের প্রমাণ চাইল। তাই মূসা আলাইহিস সালাম নিজের হাতের লাঠিটি নিক্ষেপ করার সাথে সাথে তা বিরাটাকার ভয়ংকর একটি সাপের রূপ ধারণ করল। সেই ঘটনার কথাই কুরআন বর্ণনা করছে এভাবে,
قَالَ إِنْ كُنْتَ جِئْتَ بِآيَةٍ فَأْتِ بِهَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ ۞ فَأَلْقَى عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ ثُعْبَانٌ مُبِينٌ
“ফিরআউন বলল, তুমি যদি কোন নিদর্শন এনে থাক তাহলে তা পেশ করো, যদি তুমি সত্যবাদী হও। তখন মূসা তাঁর লাঠি নিক্ষেপ করল অমনি তা একটি সাপে পরিণত হল।”

এই আয়াতে সাপের জন্য ব্যবহৃত শব্দটি হলো সু’বানুন। যার অর্থ হলো ভয়ংকর ও বিশালাকার সাপ। সাধারণ ছোটখাট কোন সাপ নয়। এই ক্ষেত্রে যেহেতু ফিরআউন তাঁর নবুওয়তকে অস্বীকার করে প্রমাণ চেয়েছিল, তাই প্রয়োজন ছিল এমন বড় কোন নিদর্শনের, যা দেখে সে ভয় পেয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলাও প্রয়োজনানুগ ব্যবস্থা নিলেন এবং লাঠিটাকে বিশাল বড় ভয়ংকর সাপে পরিণত করলেন।

এই দুই আয়াতের সাধারণ অনুবাদে আমরা দেখব, লাঠিটা শুধু সাপে রূপান্তরিত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সাপটা কেমন ছিল, এবং দুই সাপ দুই রকম হওয়ার কারণ কি ইত্যাদি অনুবাদ থেকে বোঝার কোন সুযোগ নেই। যদি আরবি জানা থাকে, তখন সহজেই বিষয়টি বুঝে নেওয়া সম্ভব। এসব কারণেই কেউ যদি শুধু অনুবাদের সাহায্য নিয়ে কুরআনকে পুরোপুরি অনুধাবন করতে চায় তা কখনও সম্ভব না।

আল্লাহ মূসা (আঃ) কে ডেকে একটি mission দিলেন, তা হলোঃ “এখন তুমি যাও  ফেরাউনের কাছে, সে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে” (আয়াত  ২৪)। এটি সত্যিই একটা কঠিন মিশন ছিলো। তখন মূসা (আঃ) একজন ফেরারী আসামী  হিসাবে ছিলেন, মিশর ছিলো তখনকার সবচেয়ে উন্নত ও শক্তিশালী রাজত্ব, সবচেয়ে  সুরক্ষিত স্থাপনা ও সবচেয়ে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা পার হয়ে তখনকার  সবচেয়ে শক্তিশালী, স্বৈরাচারী, নিষ্ঠুর শাসক - ফেরাউন এর কাছে গিয়ে তার ভুল  ধরে তাকে শোধরানোর উপদেশ দেয়াটা ছিলো মূসা (আঃ) এর mission. এ যেন আসলেই Mission Impossible !!!     

ফেরাউনকে সঠিক পথের দাওয়াত দিতে যাওয়ার কঠিন মিশনে মূসা (আঃ) কোন শক্তিশালী সেনাবাহিনী, অত্যাধুনিক যানবাহন, অস্ত্র, বিপুল অর্থ সম্পদ, ছদ্মবেশ ইত্যাদি চাননি। বরং তিনি চেয়েছেন প্রশস্ত বুক, সহজসাধ্য কাজ, জড়তাহীন জিহবা, বোধগম্য কথা ও একজন সাহায্যকারী। ( আয়াত ২৫-৩০) 
    
আল কুরআনের ২০ তম সূরা ত্বহা তে মূলত আল্লাহর সাথে মূসা (আঃ) এর ঘটনাকে প্রাধান্য দিয়ে বর্ননা করা হয়েছে।  ২৬ তম সূরা শুয়ারা তে মূলত মূসা (আঃ) এর সাথে ফেরাঊন এর ঘটনাকে প্রাধান্য দিয়ে বর্ননা করা হয়েছে।  ২৮ তম সূরা কাসাস এ মূলত মূসা (আঃ) এর ছোট ও কম বয়সের ঘটনাকে প্রাধান্য দিয়ে বর্ননা করা হয়েছে।  

প্রশস্ত বুক এর দ্বারা সত্য, ন্যায় ধারন, বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। আল্লাহর সাহায্যের মাধ্যমে কঠিন কাজ অত্যন্ত সহজ হয়। মূসা (আঃ) এর জিহবায় জড়তা ছিলো যা বোধগম্য কথা বলতে সহায়ক ছিলো না। বোধগম্য কথা বলার পর তা বোধগম্য হতে শ্রোতার শ্রবন ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধিমত্তা বিকশিত থাকা দরকার হয়। মূসা (আঃ) তাই চেয়েছেন। বড় কাজে সহযোগী থাকলে পরামর্শ করা যায়, সহযোগিতা নেওয়া যায়।    
(ফেরাউন) বললো, “তোমারা ঈমান আনলে, আমি তোমাদের অনুমতি দেবার আগেই?” দেখছি, এ তোমাদের গুরু, এ (মূসা আঃ) ই তোমাদের যাদুবিদ্যা শিখিয়েছিল। এখন আমি তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কাটাচ্ছি এবং খেজুর গাছের কাণ্ডে তোমাদের শুলিবিদ্ধ করছি, এরপর তোমরা জানতে পারবে আমাদের দু’জনের মধ্যে কার শাস্তি কঠিন ও দীর্ঘস্থায়ী”। (আল কুরআন; ২০ তম সূরা ত্বহা, আয়াত ৭১)      আল্লাহ কেটে ফেলা, শুলে চড়ানোর বীভৎস দৃশ্য বর্ননা না করে অল্প ভাষায় তখনকার অবস্থা বর্ননা করেছেন এবং আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে এমন হৃদয় বিদারক, বীভৎস দৃশ্য বর্ননা করতে হয়।   

সূরা তহার ২৫-২৮, ১১৪ আয়াতে রব্বি শব্দটি এসেছে। ‘রব্বি’ ও ‘রব্বানা’ শব্দটি মূলত দুটি করে শব্দ। ‘ইয়া রব্বি’ ও ‘ইয়া রব্বানা’। কিন্তু ‘ইয়া’ বা ‘হে’ শব্দটি আল্লাহর ক্ষেত্রে বিলুপ্ত করে ব্যবহার করা হয়। আল্লাহ  আমাদের খুবই কাছের, আপন বিধায় দূরবর্তি সংক্রান্ত শব্দ ‘হে’ বাদ দিয়ে শুধু রব্বি বা রব্বানা বলা হয়। সুবহানাল্লহ!


২০ তম সূরা তহা, আয়াত ৮০ এ এসেছে পবিত্র আসমানি খাবার যা নাযিল হয়েছিল বনী ইসরাঈলদের জন্য। নাম মান্না ও সালওয়া। মান্না এক প্রকার খাবার যা উদ্ভিদের উপর নাযিল হতো। আর সালওয়া এক প্রকার পাখী যা সহজে ধরা যেত। এর দ্বারা আল্লাহর দেয়া খাদ্য নেয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যা ছিল সহজলভ্য, উপকারি। কিন্তু বনী ইসরাইল তাতে সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি।

“যিকির” (উপদেশমালা) এর প্রধানতম উৎস হলো আল কুরআন। এই কুরআন থেকে বিমুখ  হয়ে অন্য মতবাদ/ব্যবস্থার পিছে ছুটলে তার জন্য দুনিয়ার জীবন সংকীর্ণ হবে,  লাঞ্ছনা নেমে আসবে এবং আল কুর আনের আলোকে দৃষ্টিপাত না করার কারনে কিয়ামতের  দিন আল্লাহ তাকে হাজির করবেন অন্ধ বানিয়ে!!! 

  সুতরাং এই জীবনে  চক্ষুষ্মান হলেও আল কুরআন না বুঝে, সেই অনুযায়ী নিজের জীবন না চালিয়ে, আল  কুর আনের চশমা না পরে দুনিয়ার রঙ্গিন চশমা পরে অন্য জীবন ব্যবস্থায় চললে  সংকীর্নতা ও (১২৪ নং আয়াত অনুযায়ী) আখিরাতে অন্ধ হয়ে যাওয়ার রিস্ক থেকে যাচ্ছে!!! 


উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)